হুমায়ুন আহমেদের সেরা ১০ গল্প

আমি প্রয়াত সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের অনেক বড় একজন ভক্ত। গুণী লেখকের আমার মতো আরো অনেক ভক্তের কারণেই মৃত্যুর এতো বছর পর-ও তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। কথাসাহিত্যিকের গল্প বা উপন্যাসগুলো নিয়ে কাউকে ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকা করতে দেখিনি, বা করলেও তা হয়তো আমার নজর এড়িয়ে গেছে। এখানে হুমায়ুন আহমেদের গল্পসমগ্র থেকে শুধুমাত্র লেখকের ছোটোগল্পের তালিকা করা হয়েছে, মিসির আলীর কিছু ছোটোগল্প-ও ঢুকে পড়েছে এই সঙ্কলনে। উপন্যাসগুলো এই তালিকায় নেই। এটি শুধুই আমার দৃষ্টিকোণ বা মতামত থেকে হুমায়ুন আহমেদের লেখা সেরা ১০ ভালো গল্পের তালিকা, জেনারেল অপিনিয়ন নয়। স্পয়লার অ্যালার্ট দিয়ে দিচ্ছি, কারণ গল্পের র‍্যাঙ্কিং-এর সাথে কাহিনীসংক্ষেপ-ও যুক্ত করছি এখানে, বোঝার সুবিধার জন্য। সাথে কিছু মন্তব্ব্য-ও সংযুক্ত করছি। আপনার মতামত-ও জানাবেন।

হুমায়ুন আহমেদের সেরা ১০ গল্পঃ

অনারেবল মেনশনঃ একটি নীল বোতাম, জীবনযাপন, অসুখ, একজন ক্রীতদাস, অচিন বৃক্ষ, গুনীন, শাহ মকবুল, অতিথি, নয়া রিকশা, পাথর।

১০।পাপ/হাজী মান্না মিয়া

কাহিনীসংক্ষেপঃ গল্পটি হাজী মান্না মিয়াকে নিয়ে, যিনি মক্কায় হজ্বে যেতে চান। কিন্তু মক্কায় যেতে অসমর্থ হওয়ায় তিনি মনে করেন, আল্লাহপাক কোনো কারণে তার ওপরে নাখোশ, এবং তিনি চান না মান্না মিয়া হজ্বে যান। মান্না মিয়া তার অবশিষ্ট জীবন কাটিয়ে দেন আল্লাহ-র কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে, সেই অজানা পাপের জন্য, যার কারণে তিনি শাস্তি পাচ্ছেন।
মন্তব্ব্যঃ গল্পটি শুরু হয় হাস্যরসাত্মক অবতারণার মাধ্যমে। লেখক-ও প্রথমেই হাজী মান্না মিয়াকে কমিকালভাবেই তুলে ধরেছেন পাঠকের কাছে। এরপরই ধীরেধীরে গল্পটি একটি সাইকোলজিক্যাল সমস্যার ভেতরে সময় নিয়ে ঢুকেছে। মান্না মিয়া-র “পাপ” বিষয়ক অবসেশন-ই গল্পের মূল উপজীব্য, যেটি কিনা অনেকটা “সালাম সাহেবের পাপ” গল্পের সাথে সাঙ্ঘর্ষিক।

৯।বুড়ি

কাহিনীসংক্ষেপঃ আমেরিকায় পড়াশোনা করার সময়ে লেখক একটি রুমিং হাউজে বসবাস করেন, যেখানে তিনি পরিচিত হন বিরক্তি উদ্রেককারী বুড়ি এলিজাবেথের সাথে। অধিক রাতে ব্যাগপাইপ বাজিয়ে তিনি কাউকেই ঘুমাতে দেননা। প্রত্যেককেই উঠে তাকে এসে অনুরোধ করতে হয় এই অত্যাচার বন্ধ করতে। পরবর্তীতে জানা যায়, এ সকল কর্মকান্ডই ছিলো বৃদ্ধার অখন্ড একাকীত্বের থেকে বাঁচার একটি উপায়। 
মন্তব্ব্যঃ একজন আমেরিকান বৃদ্ধার একাকী জীবন চিত্রিত হয়েছে এই গল্পে। প্রথম পুরুষে থেকে শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত পাঠককে বৃদ্ধার জীবন সম্পর্কে অন্ধকারে রেখেছেন লেখক। শেষ মুহুর্তের চমকটিই গল্পটিকে সাধারন থেকে অসাধারন করে তুলেছে।

৮।পাপ

কাহিনীসংক্ষেপঃ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ধলা গ্রামের একজন সাধারন গ্রামবাসীর স্ত্রী ফুলি-র কাছে আত্মগোপন করে একজন পাকিস্তানি মিলিটারি। ফুলিকে বেহেনজী ডাকা হানাদারকে ভাইয়ের মতো স্নেহ করা ফুলি তাকে বাঁচাতে চায়। কিন্তু তার স্বামী তাকে মিথ্যা বলে মিলিটারিটিকে ধরিয়ে দেয় মুক্তিবাহিনীর কাছে। 
মন্তব্ব্যঃ এই গল্পটি যথেষ্ঠ বিখ্যাত। স্বাধীনতার সময়ে বিপক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের সকলের মনেই শুধু ঘৃণা আছে। এই গল্পটিতে বিপক্ষ শক্তির একজনকে প্রোট্যাগোনিস্ট হিসেবে তুলে ধরেছেন লেখক, যেটা সচরাচর কোনো লেখায় দেখা যায় না। এই বিপরীতমুখী মনোভাবই গল্পটিকে বিশেষ করে ফুটিয়ে তুলেছে। ফুলির স্বামীর মনস্তত্বকেও অসাধারনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই গল্পে।

৭।চোখ

কাহিনীসংক্ষেপঃ কেন্দুয়া বাজার থেকে পাকড়াও করা হয়েছে চোর মতি মিয়াকে, বেঁধে রাখা হয়েছে বরকত সাহেবের বারান্দায়। গ্রামের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাদ-আছর খেজুর কাঁটা দিয়ে চোর মতি মিয়ার চোখে তুলে ফেলা হবে। মতি আশা করছে আছরের আগে কিছু একটা হবে, তাকে বাঁচাতে কেউ না কেউ নিশ্চয়ই এগিয়ে আসবে।মন্তব্ব্যঃ এই গল্পে লেখক অবতারণা করেছেন চোর মতি মিয়ার অবচেতন মনের দ্বন্দকে। মতি মিয়ার মনস্তত্বের অদ্ভূত টানাপোড়েন বর্ণিত হয়েছে এখানে। মতি মিয়া প্রথম পুরুষ হিসেবে পাঠককে পুরোটা সময়েই আবদ্ধ রেখেছে অনতিবিলম্বে সংঘঠিত হতে যাওয়া একটি পৈশাচিক ব্যাপারের অবতারণায়।

৬।রূপা

কাহিনীসংক্ষেপঃ ছেলেটি প্রথম দর্শনেই ভালোবেসে ফেলে এক সুন্দরী তরুণীকে। তরুণীর গাড়ীর ড্রাইভারের কাছ থেকে তার বাসার ঠিকানা নিয়ে নিজের ভালোবাসার কথা কাগজে লিখে ভেতরে পাঠায়। সারাদিন তরুণীর বাসার বাইরে অভুক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থেকে, বৃষ্টিতে ভিজে ভালোবাসার প্রমান দেওয়ার পর, শেষপর্যন্ত মেয়েটি বেরিয়ে এসে ছেলেটির ভালোবাসাকে গ্রহণ করে। ছেলেটি অবাক হয়ে দেখে মেয়েটি তার অপরিচিত।মন্তব্ব্যঃ একজন প্রেমিকের খুব অদ্ভূত একটি মানসিক টানাপোড়েন তুলে ধরা হয়েছে এখানে। ভালোবাসার খোঁজ করে একজন মানুষ সেই ভালোবাসা পেয়ে যখন আবিষ্কার করে, যে সেই ভালোবাসা সম্পূর্ণ অপরিচিত স্থান থেকে এসেছে, তখন তার মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে, তা-ই এখানে দেখানো হয়েছে।

৫।সালাম সাহেবের পাপ

কাহিনীসংক্ষেপঃ গতানুগতিক জীবনযাপন চালিয়ে যাওয়া সালাম সাহেব হঠাত একদিন তার স্ত্রী মহলকে বলেন, যে তিনি জীবনে ভয়াবহ একটি পাপ করেছেন। পাপটি এতোই ভয়ানক, যে মহান আল্লাহ-ও হয়তো তাকে ক্ষমা করবেন না, তবে তিনি আজীবন এর প্রায়শ্চিত্ত করে যাবেন। অনেক বিশেষজ্ঞ দেখানোর পর-ও সালাম সাহেব কারো কাছেই বলেন না, যে তিনি কি পাপ করেছেন। 
মন্তব্ব্যঃ অ্যাকিউট অবসেশন নিয়ে খুবই অদ্ভূত গল্প এটি। এই গল্পের মাহাত্ম এটি, যে গল্পটি পড়ার সময় পাঠকের ভেতরেও একসময় উৎকণ্ঠা কাজ করা শুরু করে, যে সালাম সাহেবের পাপটি আসলে কি। গল্পটি পাঠককে নিয়ে যাবে মনস্তত্বের একদম গভীরে, গল্পের শেষেও এর রেষটি রয়ে যাবে।

৪।তিনি

কাহিনীসংক্ষেপঃ ষাটোর্ধ একজন প্রৌঢ় হঠাত নিজেকে আবিষ্কার করেন একটি চশমার দোকানের সামনে। কিছুতেই তিনি মনে করতে পারেন না, যে তিনি কে, বা এখানে কি করছেন। কিছু মনে পড়ে যাবে এই আশায় তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করেন তিনি। এক সময় আতঙ্কিত বোধ করা শুরু করেন। 
মন্তব্ব্যঃ অসাধারন একটি গল্প। শুরু থেকেই লেখক পাঠককে গল্পের ভেতরে অন্তর্ভূক্ত করে ফেলেন। এ ধরনের মানসিক বৈকল্যের ভেতরে পড়লে একজন মানুষের ভেতরে কি চলতে পারে, কেমন চিন্তাভাবনা সে করে, তা-ই তৃতীয় পুরুষের মাধ্যমে লেখক বলেছেন এখানে। গল্পের শেষ পর্যন্ত পাঠককে বসবাস করতে হবে ষাটোর্ধ প্রৌঢ়ের অবচেতন মনে।

৩।জিন-কফিল

কাহিনীসংক্ষেপঃ ধুন্দুলনাড়া গ্রামের ইমাম সাহেবের স্ত্রী লতিফা গর্ভবতী। কিন্তু প্রসবের পরই তার বাচ্চাকে মেরে ফেলছে তার ওপরে আছর করা জিন-কফিল। জিন লতিফা বা ইমামকে কিছু করে না, কিন্তু স্বপ্নের মধ্যে লতিফাকে হুমকি দেয় তার অনাগত সন্তানকে খুন করার। মিসির আলীর সাহায্য নিয়ে লেখক ভেদ করেন জিন-কফিলের রহস্য।মন্তব্ব্যঃ এই গল্পটিতেও মনস্তত্বের গভীরে যাওয়ার প্রচেষ্টা আছে। মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন একজন মানুষের অবসেশন ও ডিলিউশন ছিলো গল্পটিতে। গল্পটিতে শেষ মুহুর্তে পর্যন্ত পাঠক কনফিউজড থাকবেন, যে প্রকৃতপক্ষে রহস্যের সমাধান কিভাবে হবে।

২।গন্ধ

কাহিনীসংক্ষেপঃ আব্দুল করিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তার স্ত্রী যমুনাকে খুনের অপরাধে। আব্দুল করিমের জীবন কাটছে জেলের অন্ধকার গারদের ভেতরে। ফাঁসীর আদেশ হয় তার। ফাঁসীর মঞ্চে দাঁড়িয়ে করিমের অবচেতন মন তার সামনে এনে দেয় যমুনার খুনের রহস্য। সে বুঝতে পারে কে তার স্ত্রী-কে খুন করেছে।
মন্তব্ব্যঃ অসাধারন একটি গল্প। ফাঁসীর আদেশ পাওয়া আব্দুল করিমের চিন্তাজগতের গহীনে বিচরণ করবেন এখানে পাঠক। একজন মৃত্যুদন্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামী তার জীবনের শেষমুহুর্তে কি চিন্তা করে, কি চলে তার মননে, সেটির ঝলকই পাবেন পাঠক এখানে। আমার ব্যক্তিগতভাবে খুব পছন্দের গল্প এটি।

১। কল্যানীয়াসু

কাহিনীসংক্ষেপঃ দম্পতির সুখের সংসারে অযাচিতভাবে উপস্থিত হন স্ত্রী জরীর কলেজের প্রোফেসর আনিস স্যার। স্বামী জরীকে সন্দেহ করা শুরু করে। জরী ছোটোবেলা থেকেই আনিস স্যারের প্রতি দুর্বল ছিলো, স্বামীর সন্দেহ তাকে ধীরেধীরে আরো ঠেলে দেয় বৃদ্ধ শিক্ষকের দিকে। স্বামীর প্রতি বিতৃষ্ণা থেকে একসময় তাকে খুন করতে চায় জরী, কিন্তু শেষ মুহুর্তে মানসিক যুদ্ধে হেরে যায় তার স্বামীর কাছে।
মন্তব্ব্যঃ আমার মতে প্রয়াত লেখকের সেরা গল্প এটি। গল্পটিতে প্রথম পুরুষে একজন চিত্রশিল্পীর জবানীতে তার স্ত্রী জরীর সাথে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন বর্ণিত হয়েছে এখানে। গল্পটি একইসাথে একটি সুখানুভূতির অনুভূতি দেয় পাঠককে, আবার ক্ষেত্রবিশেষে ডুবিয়ে দেয় বিষাদের সাগরে।

ব্লগটি লিখেছেন: এ বি হাসান চেীধুরী
লেখকের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট: AB Hasan Chowdhury

Leave a Reply