শঙ্খরঙা জল : জীবনের গল্প | তানিয়া সুলতানা | বই রিভিউ

প্রেক্ষাপট

কঙ্কানগর একটি মফস্বল শহর। শহরের আর দশটা বাড়ির মতো সৈয়দ বাড়িও একটা। সৈয়দ বাড়ির সত্ত্বাধিকারী ছিলেন সৈয়দ জসীম। তার স্ত্রী রাবেয়া এবং এক ছেলে হারুন এবং এক মেয়ে শিরিন। সুখেরই সংসার বলা চলে।

মৃত্যুর আগে সৈয়দ জসীম তার বিষয়সম্পত্তি সব কিছু ছেলে হারুনের নামে করে দিয়ে যান। রাবেয়া যদিও হারুনের সৎ মা তারপরও তিনি এবিষয় নিয়ে কিছু বলেননি। কারণ তিনি হারুনকে নিজের ছেলের মতোই বা নিজে গর্ভের ছেলের থেকে বেশি ভালোবাসেন।

হারুনের বোন শিরিন, যে রাবেয়ার নিজ সন্তান, সে তার স্বামী জুবায়েরকে নিয়ে থাকে সৈয়দ বাড়িতেই। তারা তারা পালিয়ে বিয়ে করেছে। অনেক কিছুর পর সৈয়দ জসীম তা মেনে নেয়।

হারুনকে তাঁর বাবা সব সম্পত্তি লিখে দেয়াতে রাবেয়ার আপত্তি না থাকলেও ছিলো তাঁর বোন শিরিন এবং তাঁর স্বামী জুবায়েরের। তাঁরা ভেবেছিলাম গঞ্জের আড়ৎ নাহলেও অন্তত বাড়িটা তাদের নামে লিখে দিবে।

যথারীতি হারুন এর বিয়ের সময় উপস্থিত। তার মা রাবেয়া তার জন্য পাত্রীর খোঁজে গেদু ঘটককে দায়িত্ব দেয়। গেদু ঘটক পাত্রীর খোঁজে নেমে পড়ে।

কুমু এক অজপাড়াগাঁ এর এক গরিব মাঝীর মেয়ে। কুমুর জন্ম হয় এক ঝড়ের রাতে। জন্মের সময়ই তাঁর মা মারা যায়। বাবা মঈন মাঝী বেশ আদরে বড় করতে থাকে মেয়েকে।

মেয়ের ভবিষ্যতের কতা চিন্তা করে মঈন মাঝী নিজের অসুখ-বিসুখের কথা না ভেবে দিনরাত কসরত করে যায়। কুমুর মানাও সে শোনে না। এমনি করে একদিন নদীতে যায় মঈন মাঝী। হঠাৎ করে ঝড় ওঠে। এই ঝড়কে বড় ভয় কুমুর। অবশেষে তার ভয়ই সত্যি হলো। বাবা আর ফেরেনি সে ঝড়ের রাতের পর।

বাবাকে হারিয়ে কুমু যখন নিঃস্ব, এদিকে কুমুর মায়ের চিকিৎসার জন্য মহাজনের কাছ থেকে টাকা এনেছিলো তাঁর বাবা, বাড়িটি বন্দক রেখে। বাবার মৃত্যুর পর মহাজন ঘোষণা করে বাড়ি সে দখল করবে। কেউ ছিলোনা কুমুর পক্ষ হয়ে মহাজনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দুটো কথা বল।

বাবার মুখে কুমু শুনেছিলো তারা এক মামা আছে শহরে থাকে। যিনি মাঝে মাঝে চিঠি দিয়ে তাদের খোঁজ খবর নেয়। শেষে উপায়ন্তর না পেয়ে কুমু বাবার টাংক থেকে পুরোনো সে চিঠিগুলো নেয় এবং সে ঠিকানা অনুযায়ী চিঠি লিখে তাঁর বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করে।

তাঁর চিঠি পেয়ে তাঁর মামা শরিফ সাহেব আসেন এবং কুমুকে নিয়ে আসেন তাঁর বাড়িতে। মামার বাড়িতে থেকে যায় কুমু। মামী তাঁর সাথে কাজের মেয়ের মতো ব্যাবহার করলেই মুখ বুঝে সব সহে নেয় কুমু।

মামা শরিফ সাহেব একসময় কুমুর বিয়ের কথা ভাবেন। এবং নানান ঘটনাক্রমে গেদু ঘটকের মাধ্যমে হারুনের সাথে বিয়ে ঠিক হয়।

একদিন কুমু শুনতে পায় তাঁর মামা-মামী তার বিয়ে নিয়ে কথা বলছে। একসময় সে শোনে যে, আমাদের দেশের প্রথা অনুযায়ী কন্যার পরিবার বরের পরিবারকে টাকা পয়সা প্রদান করে। কিন্তু তাঁর বেলায় উল্টো। তখন সে আঁচ করে যে, এ বিয়ের মধ্যে কোনো রহস্য আছে।

কুমু ভাবে হয়তো পাত্র বুড়ো কারণ গ্রামে গঞ্জে তো টাকার বিনিময়ে বুড়োর সাথে ষোড়শী কন্যার বিয়ে তো অহরহ হচ্ছে। এভাবেই এগিয়ে চলে উপন্যাসের চিত্ররূপ।

চিত্র : বই শঙ্খরঙা জল।
চিত্রসূত্র : লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ থেকে।

চরিত্র চিত্রন: ‘শঙ্খরঙা জল’ উপন্যাসে বেশ কয়েকটি চরিত্র খুবই শক্তিশালী। চরিত্রগুলো হল: রায়েবা, হারুন, কুমু (কোমল), শিরিন, জুবায়ের এবং আরও একটি শক্তিশালী চরিত্র রয়েছে, সে হলো হারুনের বন্ধু গলু।

রাবেয়া : উপন্যাসটির অন্যতম প্রধান একটি চরিত্র রাবেয়া। যে সৈয়দ বাড়ির কর্তৃ। হারুন এবং শিরিনের মা। হারুন যদিও রাবেয়ার নিজের সন্তান না তবুও সে হারুনকে নিজ সন্তান শিরিনের থেকেও বেশি ভালোবাসে। রাবেয়াকে এই উপন্যাসে একজন আদর্শ মা এবং আদর্শ শ্বাশুড়ি হিসেবে চিত্রন করা হয়েছে।

হারুন : শঙ্খরঙা জল উপন্যাসের নায়ক চরিত্র হারুন। যে ছোট বেলায় মা কে হারিয়েছে। মায়ের মৃত্যু হারুন মেনে নিতে না পেরে এক বিকট চিৎকার করে, যার কারণে সে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে। হারুনকে উপন্যাসে একজন আদর্শ স্বামী, ভাই, ছেলে এবং একজন আদর্শ বন্ধু হিসেবে দেখানো হয়েছে। হারুনের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্বেও সে তার সাধ্য অনুযায়ী সবার জন্য সবটুকু করতে চেয়েছিলো। নিজ স্ত্রী এবং সন্তানের জন্য ছিলো তার অশেষ ভালোবাসা

কুমু (কোমল) : শঙ্খরঙা জল উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র-ই হলো কুমু। উপন্যাসের নায়িকা চরিত্র কুমু। উপন্যাসটি মূলত কুমুর জীবন সংগ্রামের গল্প। কুমুকে উপন্যাসটিতে একটি সংগ্রামী চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর জীবন শুধু সংগ্রামের মাধ্যমে-ই অতিবাহিত হয়েছে। স্বামীর সংসারে এসেও তার রেহাই মেলেনি। স্বামীর মৃত্যুর পর তাকে পড়তে হয় ননদের স্বামীর কুনজরে। কুমুকে লেখিকা গ্রাম-বাংলার সংগ্রামী কুল বধূ হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন।

শিরিন : শিরিন চরিত্রটি একজন নিয়তির খেলায় হেরে যাওয়া মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। যে না ফেলো মাতৃ সুখ, না ফেলো স্বামী সুখ, না ফেলো সাংসারিক সুখ৷ সারাটি জীবন সে কাটিয়ে গেল ভালোবাসা হীনতায়। যে একটু সুখের জন্য চটপট করে কাটিয়েছে পুরো জীবন।

জুবায়ের : জুবায়ের হলো শঙ্খরঙা জল উপন্যাসের খল নায়ক চরিত্র। যে নিজের বাড়ি রেখে শ্বশুর বাড়ি ঘরজামাই হয়ে থাকে। জুবায়ের যখন দেখলো তাঁর শ্বশুর সব সম্পত্তি লিখে দিলো তার শালা হারুনকে, তখন সে প্রচন্ড রাগান্বিত হয়। সে মুলত শিরিনকে বিয়ে-ই করেছিল তার বাবার সম্পত্তির লোভে। যখন সে দেখলো সব সম্পত্তি তার হাতছাড়া হয়ে গেছে তখন সে নানান কুমতলব আঁটতে থাকে সম্পত্তি গুলো নিজের দখলে নিয়ে নিতে।

গলু : গলু শঙ্খরঙা জল উপন্যাসের অন্যতম একটি চরিত্র। যে হারুনের বন্ধু। গলুর বয়স বাড়লেও তাঁর বুদ্ধি সে অনুযায়ী বাড়েনি। সে বয়স হওয়ার পরও একেবারে বাচ্চা হয়েই থেকে যায়। উপন্যাসটিতে লেখিকা গলুকে একজন আদর্শ বন্ধু হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বন্ধু হারুনের মৃত্যুর পর সে একা হয়ে যায়। কিন্তু সে মাঝে মাঝে রাতে হারুনের গায়ের গন্ধ পায়। আর ছুটে আসে হারুনের কবরের কাছে। গলুই কুমুকে জুবায়েরের হাত থেকে বাঁচায় প্রাণপন যুদ্ধ করে।

লেখিকা পরিচিতি : ‘শঙ্খরঙা জল’ উপন্যাসের লেখিকা ‘তানিয়া সুলতানা’। জন্ম কুমিল্লার জানঘর গ্রামে। ১০ বছর বয়স অব্দি গ্রাম এবং ঢাকা মিলিয়ে কেটেছে। ১৯৯৯ সালে পাড়ি জমান ইটালির রোম শহরে। তারপর সেখানেই বেড়ে ওঠা। ছোট্ট একটি লাইব্রেরি থেকে বাংলা উপন্যাস সংগ্রহ করার মাধ্যমেই বইয়ের জগতে প্রবেশ। পড়তে পড়তেই লেখার আগ্রহ অন্তরে লালন করা। তাঁর প্রথম মৌলিক উপন্যাস ‘ভাঙা জোছনা’ প্রকাশিত হয় ২০১৬ বই মেলায়। লেখালেখি ছাড়াও ছবি আঁকার নেশা আছে। প্রথম দুটো উপন্যাসের প্রচ্ছদ নিজেই এঁকেছেন। এছাড়াও অন্য লেখকদেরও কিছু প্রচ্ছদ করেছেন তিনি।[১]

চিত্র : তানিয়া সুলতানা
চিত্রসূত্র : শঙ্খরঙা জল উপন্যাস থেকে।

বইটিতে উল্লিখিত কিছু উক্তি :

“কতরঙা মানুষ যে দেখলাম এই ছোট্ট জীবনে। মানুষের ভীড়ে ঘাপটি মেরে থাকে কিছু অমানুষ। বিবেকহীন এসব অমানুষের কাতারে যেমন নারী আছে, আছে পুরুষ। অবশ্য অমানুষের কোনো জাত নেই। অমানুষ শুধুই অমানুষ”।

“বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন একান্ত আপন কিছু মানুষের। কিছু না হলেও অন্তত কেউ একজন। সেই কেউ একজন ছাড়া প্রতিটি মানুষ যেন মরুর বুকে বেড়ে ওঠা একলা বৃক্ষ। ধুধু বালির বুকে তাপিও বাতাসে হেলে পড়া বিষন্ন ডালের বৃক্ষ”।

“সংসার চলে দুটি মানুষের সমঝোতায়। ভালোবাসার পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে সে কেমন সংসার?”

“এক জনমে মানুষের ভালোবাসার পিপাসা কখনোই শেষ হয় না”।

অসাধারণ একটা উপন্যাস ‘শঙ্খরঙা জল’। এ উপন্যাসে অঙ্কিত গল্পটি মানুষের জীবনের অতি চেনা একটি গল্প। গল্পের কুমুর মতো আমাদের দেশে প্রায় মেয়েদের হতে হয় এমনি নানান অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন। যার করালগ্রাস থেকে কেউ হয়তো রক্ষা পায় কেউবা পায় না।

রিভিউটি করেছেনঃ বোহেমিয়ান শুভ্র
ফেসবুক আইডিঃ বোহেমিয়ান শুভ্র

তথ্যসূত্র :
১. শঙ্খরঙা জল উপন্যাসে উল্লিখিত লেখিকার পরিচিতি।

Leave a Reply